কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশিত ৫ জানুয়ারি, ২০২৬ সালের একটি গবেষণা অনুসারে, গবেষকরা ১৬৮টি সাধারণ রাসায়নিক চিহ্নিত করেছেন যা স্বাস্থ্যকর অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়াকে ব্যাহত করতে পারে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে এই রাসায়নিক পদার্থগুলো, যা সাধারণত কীটনাশক এবং প্লাস্টিকের মধ্যে পাওয়া যায়, অণুজীবের বৃদ্ধিতে বাধা দিতে পারে যা সামগ্রিক স্বাস্থ্য বজায় রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মানুষের তৈরি বহুল ব্যবহৃত রাসায়নিক নিয়ে করা একটি বৃহৎ গবেষণাগার বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে এই পদার্থগুলোর মধ্যে অনেকগুলোকেই আগে জীবন্ত প্রাণীর জন্য ক্ষতিকর বলে মনে করা হতো না। এই আবিষ্কার রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসার কারণে মানব স্বাস্থ্যের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই প্রকল্পের প্রধান গবেষক ডঃ অনন্যা শর্মা বলেন, "আমরা দেখে অবাক হয়েছি যে দৈনন্দিন ব্যবহারের কত রাসায়নিক আমাদের অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। এই পদার্থগুলোর সাথে আমাদের নিয়মিত দেখা হয় এবং আমাদের মাইক্রোবায়োমের উপর তাদের প্রভাব এতদিন পর্যন্ত প্রায় অজানা ছিল।"
অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়া যখন এই রাসায়নিকগুলোর সংস্পর্শে আসে, তখন তারা দুর্বল হয়ে যেতে পারে, যার ফলে কিছু অণুজীবের মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের সৃষ্টি হতে পারে। এই ঘটনা জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় হুমকি, কারণ অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার চিকিৎসা করা ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছে।
অন্ত্রের মাইক্রোবায়োম, যা পাচনতন্ত্রে বসবাসকারী অণুজীবের একটি জটিল সম্প্রদায়, মানব স্বাস্থ্যের জন্য একটি অত্যাবশ্যকীয় ভূমিকা পালন করে। এটি হজম, পুষ্টি শোষণ এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। এই সূক্ষ্ম ভারসাম্যের ব্যাঘাত স্থূলতা, ডায়াবেটিস এবং অটোইমিউন রোগের মতো বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যার সাথে যুক্ত।
শনাক্ত করা রাসায়নিকগুলোর মধ্যে কীটনাশক, শিল্পজাত পণ্য এবং প্লাস্টিকে ব্যবহৃত যৌগ রয়েছে। এই পদার্থগুলো দূষিত খাদ্য ও পানীয় এবং সেই সাথে সরাসরি ভোগ্যপণ্যের সংস্পর্শের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করতে পারে।
গবেষণাটি রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসার কারণে সম্ভাব্য ঝুঁকির আরও ব্যাপক মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেয়। বর্তমান ঝুঁকি মূল্যায়নগুলো প্রায়শই মানুষের ওপর সরাসরি বিষাক্ততার দিকে মনোযোগ দেয়, অন্ত্রের মাইক্রোবায়োমের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবকে উপেক্ষা করে।
ডঃ শর্মা বলেন, "আমাদের গবেষণা থেকে বোঝা যায় যে রাসায়নিক সুরক্ষা সম্পর্কে আমাদের ধারণা আরও বাড়ানো দরকার। আমাদের শুধুমাত্র মানব কোষের ওপর সরাসরি প্রভাব নয়, আমাদের অন্ত্রের ভেতরের জটিল বাস্তুতন্ত্রের ওপরের পরোক্ষ প্রভাবও বিবেচনা করতে হবে।"
গবেষকরা বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ভিত্তিক মডেল ব্যবহার করে অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ার ওপর অন্যান্য রাসায়নিকের প্রভাব সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করছেন। এই মডেলগুলো রাসায়নিক গঠন এবং মাইক্রোবিয়াল প্রতিক্রিয়ার বিশাল ডেটাসেট বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য ব্যাঘাত সৃষ্টিকারীদের চিহ্নিত করে। এই পদ্ধতি গবেষকদের দ্রুত এবং দক্ষতার সাথে হাজার হাজার রাসায়নিক স্ক্রিন করতে এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি চিহ্নিত করার প্রক্রিয়াটিকে ত্বরান্বিত করতে সাহায্য করে।
এই এআই মডেলগুলোর বিকাশ টক্সিকোলজি ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদম ব্যবহার করে গবেষকরা রাসায়নিক এবং জৈবিক সিস্টেমের মধ্যে জটিল মিথস্ক্রিয়া সম্পর্কে আরও গভীর ধারণা পেতে পারেন। এই জ্ঞান নিরাপদ রাসায়নিক তৈরি এবং মানব স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য আরও কার্যকর কৌশল তৈরি করতে সাহায্য করতে পারে।
এই আবিষ্কারের ফলস্বরূপ রাসায়নিকের সুরক্ষা মূল্যায়নের জন্য দায়ী নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর ওপর প্রভাব পড়তে পারে। গবেষণাটি ইঙ্গিত দেয় যে বর্তমান নিয়মকানুন হয়তো দৈনন্দিন রাসায়নিকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে অন্ত্রের মাইক্রোবায়োমকে পর্যাপ্তভাবে রক্ষা করতে পারছে না।
গবেষকরা রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসার কারণে অন্ত্রের মাইক্রোবায়োম এবং মানব স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবগুলো তদন্ত করার জন্য আরও গবেষণা করার পরিকল্পনা করছেন। তারা এই রাসায়নিকগুলোর ক্ষতিকর প্রভাব কমানোর কৌশলগুলোও চিহ্নিত করতে চান, যেমন প্রোবায়োটিক সাপ্লিমেন্ট তৈরি করা যা একটি স্বাস্থ্যকর অন্ত্রের মাইক্রোবায়োম পুনরুদ্ধার করতে পারে।
Discussion
Join the conversation
Be the first to comment