গ্রীনল্যান্ডের অর্থনৈতিক দুশ্চিন্তার প্রেক্ষাপটে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আর্কটিক অঞ্চলটি অধিগ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, যা ইউরোপীয় নেতাদের কাছ থেকে বিতর্ক এবং নিন্দার ঝড় তুলেছে। ডেনমার্কের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুসারে, ট্রাম্পের গ্রীনল্যান্ডে নতুন করে আগ্রহ দেখা যাচ্ছে এমন সময়, যখন দ্বীপ দেশটি ধীরগতির অর্থনীতি এবং উল্লেখযোগ্য আর্থিক চ্যালেঞ্জের সাথে লড়াই করছে। এই নতুন প্রচেষ্টা আর্কটিক অঞ্চলে ভূ-রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং এই অঞ্চলে ক্ষমতার সূক্ষ্ম ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন তোলে, বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নতুন অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সুযোগ উন্মোচিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে।
ড্যানমার্কস ন্যাশনালব্যাংকের সোरेन বিয়েরগার্ডের লেখা প্রতিবেদনটি গ্রীনল্যান্ডের অর্থনীতির গতিপথের একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে। মৎস্য শিল্প দ্বীপটির অর্থনীতির ভিত্তি হলেও, প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে, যা ২০২২ সালে ২% থেকে কমে ২০২৫ এবং ২০২৬ উভয় বছরে ০.৮%-এ নেমে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই মন্দার কারণ হিসেবে বিমানবন্দর সম্প্রসারণের মতো অবকাঠামো প্রকল্পের প্রায় সমাপ্তি এবং পরিকল্পিত জ্বালানি উদ্যোগগুলোতে বিলম্বকে দায়ী করা হয়েছে। উপরন্তু, চিংড়ি মজুদের হ্রাস এবং ২০২৫ সালে সরকারি অর্থের অপ্রত্যাশিত অবনতি অর্থনৈতিক চাপ বাড়িয়েছে, যার ফলে গ্রীনল্যান্ড ট্রেজারিতে মারাত্মকভাবে তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে। এই সমস্যাগুলোর সাথে যুক্ত হয়েছে গ্রীনল্যান্ডের জনসংখ্যা হ্রাস এবং বয়স্ক হয়ে যাওয়া, যা ২০৫০ সালের মধ্যে ২০% সঙ্কুচিত হতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে, ফলে অভিবাসীদের আকর্ষণ করা এবং বাসিন্দাদের ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
গ্রীনল্যান্ডকে অধিগ্রহণের জন্য ট্রাম্পের প্রচেষ্টা নতুন নয়। এর আগেও তিনি জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থ এবং সম্পদ আহরণের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। সাম্প্রতিক বিবৃতিতে, ট্রাম্প গ্রীনল্যান্ড অধিগ্রহণ করার বিষয়ে তার আন্তরিকতা পুনর্ব্যক্ত করেছেন, যা বিতর্ককে আরও উস্কে দিয়েছে। এই বিবৃতিগুলো ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক অভিযানের পর এসেছে, যার ফলে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে বন্দী করা হয়েছে, এবং ট্রাম্পের পরামর্শ যে অন্যান্য দেশগুলোও অনুরূপ হস্তক্ষেপের শিকার হতে পারে। এই প্রেক্ষাপট ট্রাম্পের নেতৃত্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতি এবং আন্তর্জাতিক সার্বভৌমত্বের জন্য এর প্রভাব সম্পর্কে উদ্বেগ সৃষ্টি করে।
গ্রীনল্যান্ডকে অধিগ্রহণের ধারণাটি গ্রীনল্যান্ড, ডেনমার্ক এবং ইউরোপের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে তীব্র বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছে। এই নেতারা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্রের এই অঞ্চলের উপর কোনো বৈধ দাবি আছে, এবং গ্রীনল্যান্ডের ডেনমার্ক রাজ্যের একটি স্ব-শাসিত অংশ হিসেবে অবস্থানের উপর জোর দিয়েছেন। এই পরিস্থিতি আর্কটিক অঞ্চলে জটিল ভূ-রাজনৈতিক গতিশীলতাকে তুলে ধরে, যেখানে একাধিক দেশের স্বার্থ এবং আঞ্চলিক দাবি রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যখন উত্তর মেরুর বরফ গলছে, তখন মূল্যবান সম্পদ এবং কৌশলগত শিপিং রুটে প্রবেশাধিকার ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, যা প্রতিযোগিতা বাড়িয়ে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ঝুঁকি তৈরি করছে।
গ্রীনল্যান্ডের অর্থনৈতিক সংগ্রাম এবং অঞ্চলটি অধিগ্রহণে ট্রাম্পের নতুন করে আগ্রহের সংমিশ্রণ একটি অস্থির পরিস্থিতি তৈরি করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট যেখানে তার এই পদক্ষেপকে জাতীয় নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সুযোগের বিষয় হিসেবে তুলে ধরছেন, সেখানে সমালোচকরা এটিকে আর্কটিক অঞ্চলে অন্যায্য প্রভাব বিস্তার এবং গ্রীনল্যান্ড ও ডেনমার্কের সার্বভৌমত্বকে উপেক্ষা করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন। গ্রীনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, তবে চলমান বিতর্ক বিশ্ব রাজনীতিতে আর্কটিক অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব এবং এর টেকসই উন্নয়ন ও শান্তিপূর্ণ ব্যবস্থাপনার জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেয়।
Discussion
Join the conversation
Be the first to comment