ইরানের উপর একটি ডিজিটাল ছায়া বিরাজ করছে, যা বিক্ষোভের ঢেউয়ের মধ্যে সত্যকে আড়াল করছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান অর্থনৈতিক অসন্তোষ নিরসনের প্রতিশ্রুতি দিলেও, একটি নৃশংস দমন-পীড়ন তীব্রতর হচ্ছে, যা রক্তপাত ও অনিশ্চয়তার পথ তৈরি করছে। মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর অনুমান, মৃতের সংখ্যা প্রায় ২০০-তে পৌঁছেছে, যা সম্ভবত আরও বাড়বে, কারণ প্রায় সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার মধ্যে দেশটি ঢাকা পড়েছে। ইরানে যে দৃশ্যগুলো উন্মোচিত হচ্ছে, তা কেবল রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রতিফলন নয়, বরং ডিজিটাল যুগে তথ্যের ক্ষমতা – এবং সীমাবদ্ধতা – সম্পর্কে একটি কঠোর অনুস্মারক।
অর্থনৈতিক সংকট এবং ইরানের মুদ্রার দ্রুত দরপতনের কারণে প্রাথমিকভাবে শুরু হওয়া বিক্ষোভগুলো দ্রুত সরকার পরিবর্তনের বৃহত্তর আহ্বানে রূপান্তরিত হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা, হতাশার একটি সাধারণ অনুভূতি দ্বারা উৎসাহিত হয়ে দেশটির ধর্মীয় নেতাদের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান চাইছে। জনাকীর্ণ মহানগরী থেকে শুরু করে গ্রামীণ ইরানের বিস্মৃত প্রান্ত পর্যন্ত, রাস্তাগুলো স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের দাবিতে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
তবে, ইরান সরকারের প্রতিক্রিয়া ছিল দ্রুত এবং নির্দয়। নিরাপত্তা বাহিনী कथितভাবে অস্থিরতা দমনের জন্য মারাত্মক শক্তি ব্যবহার করছে, যেখানে প্রায় সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা আরোপ করা হয়েছে, যা তথ্যের সত্যতা যাচাই করা এবং সহিংসতার মাত্রা নথিভুক্ত করা কঠিন করে তুলেছে। এই ডিজিটাল পর্দা, যা ক্রমবর্ধমানভাবে স্বৈরাচারী সরকারগুলো ব্যবহার করছে, ২১ শতকে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ এবং তথ্যের অবাধ প্রবাহের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা তুলে ধরে।
যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার ব্যবহার সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে সেন্সরশিপ এড়ানো এবং তথ্য যাচাই করার ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভূমিকা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে। এআই-চালিত সরঞ্জাম, যেমন প্রাকৃতিক ভাষা প্রক্রিয়াকরণ (এনএলপি) অ্যালগরিদম, সামাজিক মিডিয়া পোস্ট এবং সংবাদ প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করতে ব্যবহার করা যেতে পারে, যা অন্যথায় অলক্ষিত থাকতে পারে এমন প্যাটার্ন এবং প্রবণতা সনাক্ত করতে পারে। মেশিন লার্নিং মডেলগুলোকে ভুল তথ্য চিহ্নিত এবং ফ্ল্যাগ করার জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে, যা অপপ্রচার এবং ভুল তথ্যের বিস্তার মোকাবেলা করতে সহায়তা করে।
তবে, এই সরঞ্জামগুলোর সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। এআই অ্যালগরিদমগুলো কেবল তাদের প্রশিক্ষণের জন্য ব্যবহৃত ডেটার মতোই ভাল, এবং এগুলো সহজেই ম্যানিপুলেট বা পক্ষপাতদুষ্ট হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনও এআই মডেল প্রাথমিকভাবে রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত মিডিয়া থেকে ডেটার উপর ভিত্তি করে প্রশিক্ষিত হয়, তবে এটি সম্ভবত বিক্ষোভের বিষয়ে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত করবে। তদুপরি, এআই-চালিত নজরদারি প্রযুক্তি বিক্ষোভকারীদের সনাক্ত এবং ট্র্যাক করতে ব্যবহার করা যেতে পারে, যা আরও ভিন্নমতকে শীতল করে এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে দুর্বল করে।
"ইরানের পরিস্থিতি একটি অনুস্মারক যে প্রযুক্তি একটি দ্বিধারী তলোয়ার," তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের এআই এথিক্সের অধ্যাপক ডঃ লেইলা আমিন (যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার আগে কথা বলছেন) বলেছেন। "যদিও এআই স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা প্রচারের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে, তবে এটি ভিন্নমত দমন এবং তথ্য নিয়ন্ত্রণের জন্যও ব্যবহার করা যেতে পারে। মানবাধিকারকে সম্মান করে এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে উন্নীত করে এমনভাবে এআই প্রযুক্তি বিকাশ ও প্রয়োগ করা আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।"
ইরান সরকারের কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর কাছ থেকে নিন্দা কুড়িয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সহিংসতার অবিলম্বে সমাপ্তি এবং বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুর একটি স্বাধীন তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটির একজন মুখপাত্র বলেছেন, "ইরানের কর্তৃপক্ষকে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে সম্মান করতে হবে।" "নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে মারাত্মক শক্তি ব্যবহার আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।"
বিক্ষোভ অব্যাহত থাকায় ইরানের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। সরকারের কঠোর অবস্থান ইঙ্গিত দেয় যে তারা আপস করতে বা বিক্ষোভকারীদের দাবি মানতে রাজি নয়। তবে, বিক্ষোভের ক্রমবর্ধমান মাত্রা এবং তীব্রতা ইঙ্গিত দেয় যে ইরানি জনগণ তাদের অধিকার ও স্বাধীনতার জন্য লড়াই করতে বদ্ধপরিকর।
ইরানের ঘটনা ডিজিটাল যুগে পথ চলার চ্যালেঞ্জগুলো সম্পর্কে একটি সতর্কতামূলক গল্প হিসাবে কাজ করে। যেহেতু প্রযুক্তি আমাদের জীবনের সাথে ক্রমবর্ধমানভাবে জড়িত, তাই এর সম্ভাব্য সুবিধা এবং ঝুঁকি সম্পর্কে সমালোচনামূলক ধারণা তৈরি করা অপরিহার্য। গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারের ভবিষ্যৎ ভালোর জন্য এআই-এর ক্ষমতাকে কাজে লাগানোর উপর নির্ভর করতে পারে, পাশাপাশি এর অপব্যবহারের সম্ভাবনা হ্রাস করতে হবে। বিশ্ব তাকিয়ে আছে, আশা করছে ইরানের উপর থাকা ডিজিটাল ছায়া অবশেষে সরে যাবে, যা আরও ন্যায়সঙ্গত ও ন্যায্য ভবিষ্যতের পথের উন্মোচন করবে।
Discussion
Join the conversation
Be the first to comment