ঝুঁকি বিশ্লেষণকারী সংস্থা ইউরেশিয়া গ্রুপের সভাপতি ইয়ান ব্রেমারের মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক সিদ্ধান্তের কারণে দেশটি বিশ্বজুড়ে অস্থিতিশীলতার চালিকাশক্তি হিসেবে ক্রমশ বিবেচিত হচ্ছে। ব্রেমার ২০২৬ সালের ১১ই জানুয়ারি এক সাক্ষাৎকারে যুক্তি দেখান যে "আমেরিকা ফার্স্ট" (America First) দৃষ্টিভঙ্গি যুক্তরাষ্ট্রকে আইনের শাসন, অবাধ বাণিজ্য এবং সম্মিলিত নিরাপত্তার বিপরীতে দাঁড় করিয়েছে, যা বিশ্ব মঞ্চে দেশটির নির্ভরযোগ্যতাকে প্রভাবিত করছে।
ব্রেমার উল্লেখ করেন যে, কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক নির্মিত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা, ট্রাম্প প্রশাসনের পূর্বেও উল্লেখযোগ্য ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন ছিল। তবে, তিনি মনে করেন যে ভেনেজুয়েলায় ক্ষমতা প্রদর্শন এবং গ্রিনল্যান্ড সম্পর্কে জোরালো বক্তব্য রাখার মতো সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলি পরিস্থিতিকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। ব্রেমারের মতে, এই পদক্ষেপগুলি যুক্তরাষ্ট্রকে তার মিত্রদের জন্য একটি ненадежный অংশীদার এবং ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকির একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসাবে চিহ্নিত করে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি এবং বিশ্ব স্থিতিশীলতার উপর এর প্রভাব নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। ঐতিহাসিকভাবে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক নিয়ম-কানুন এবং প্রতিষ্ঠান গঠনে যুক্তরাষ্ট্র কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা, ব্রেটন উডস সিস্টেম (যা বিশ্বব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল তৈরি করেছে) এবং ন্যাটো-র মতো বিভিন্ন নিরাপত্তা জোট। এই কাঠামো গুলো বিশ্ব সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যতের সংঘাত প্রতিরোধের জন্য তৈরি করা হয়েছিল।
তবে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, এই বহুপাক্ষিক কাঠামোর প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি নিয়ে ক্রমবর্ধমান বিতর্ক দেখা দিয়েছে। সমালোচকদের মতে, সম্মিলিত পদক্ষেপের চেয়ে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে আরও একতরফা দৃষ্টিভঙ্গি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করে। কিছু লোক এই পরিবর্তনকে এমন একটি শূন্যতা তৈরি হিসাবে দেখছেন যা অন্যান্য শক্তিগুলো পূরণ করতে চাইতে পারে, যা সম্ভাব্যভাবে প্রতিযোগিতা এবং অস্থিরতা বাড়িয়ে তুলতে পারে।
উদাহরণস্বরূপ, ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র মাদুরো সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে, বিরোধী নেতা হুয়ান গুয়াইদোকে legítimo অন্তর্বর্তীকালীন রাষ্ট্রপতি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এই হস্তক্ষেপমূলক দৃষ্টিভঙ্গি কারো কারো দ্বারা জাতীয় সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন এবং অঞ্চলটিকে অস্থিতিশীল করার প্রচেষ্টা হিসাবে সমালোচিত হয়েছে। বিপরীতভাবে, সমর্থকরা যুক্তি দেখান যে যুক্তরাষ্ট্র গণতন্ত্র ও মানবাধিকার রক্ষায় কাজ করছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির এই পরিবর্তনের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। এটি কেবল ইউরোপ এবং এশিয়ার ঐতিহ্যবাহী মিত্রদের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ককে প্রভাবিত করে না, সেই সাথে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতে এর অবস্থান এবং জলবায়ু পরিবর্তন, মহামারী এবং অর্থনৈতিক সংকটের মতো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলার ক্ষমতাকেও প্রভাবিত করে। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট বিকশিত হওয়ার সাথে সাথে এবং নতুন চ্যালেঞ্জগুলো সামনে আসার সাথে সাথে বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক সম্ভবত চলতেই থাকবে।
Discussion
Join the conversation
Be the first to comment