ভাবুন তো, এমন একটা পৃথিবী যেখানে কোনো সার্চ ইঞ্জিনে একটা প্রশ্ন করার মতোই সহজে আপনি চিকিৎসা বিষয়ক পরামর্শ নিতে পারছেন। এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) চালিত সার্চের প্রতিশ্রুতি এটাই। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সুবিধা এবং নির্ভুলতার মধ্যেকার সূক্ষ্ম ভারসাম্যকে তুলে ধরে, বিশেষ করে যখন বিষয়টি স্বাস্থ্যের সঙ্গে জড়িত।
গুগল নীরবে কিছু চিকিৎসা বিষয়ক প্রশ্নের জন্য তাদের এআই ওভারভিউ (AI Overviews) বন্ধ করে দিয়েছে। সংবেদনশীল ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে যে চ্যালেঞ্জগুলো রয়েছে, এই পদক্ষেপ তারই প্রমাণ। দ্য গার্ডিয়ানের একটি প্রতিবেদনের পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ঐ প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল যে, গুগলের এআই স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিষয়ে ভুল তথ্য দিচ্ছে, বিশেষ করে লিভারের রক্ত পরীক্ষার স্বাভাবিক মাত্রা সম্পর্কে। মনে হচ্ছিল, এআই এমন কিছু সাধারণ তথ্য দিচ্ছে যা জাতীয়তা, লিঙ্গ, জাতি এবং বয়সের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে হিসাবে ধরছে না। এর ফলে ব্যবহারকারীরা তাদের পরীক্ষার ফলাফল ভুল বুঝতে পারতেন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে দেরি হতে পারত।
এআই ওভারভিউ, যা ব্যবহারকারীর প্রশ্নের দ্রুত এবং সংক্ষিপ্ত উত্তর দেওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে চালু করা হয়েছিল, সেটি গুগলের ভবিষ্যৎ সার্চের একটি ধারণা। এখানে শুধু প্রাসঙ্গিক ওয়েবসাইটের তালিকা দেওয়ার পরিবর্তে, এআই তথ্য বের করে সংক্ষিপ্ত আকারে উপস্থাপন করার চেষ্টা করে। অনেক ক্ষেত্রে এই পদ্ধতিটি আশাব্যঞ্জক হলেও, চিকিৎসার ক্ষেত্রে এটি অনেক কঠিন। মানুষের শরীর জটিল এবং চিকিৎসা বিষয়ক তথ্য প্রায়শই সূক্ষ্ম এবং প্রসঙ্গ-নির্ভর হয়। যে এআই অতিসরলীকরণ করে বা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো উপেক্ষা করে, সেটি অজান্তেই ভুল তথ্য ছড়াতে পারে, যার ফল মারাত্মক হতে পারে।
দ্য গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানে দেখা গেছে যে, "লিভারের রক্ত পরীক্ষার স্বাভাবিক মাত্রা কত" এই প্রশ্নটি করলে এআই সম্ভাব্য ভুল তথ্য দিয়ে একটি সারসংক্ষেপ তৈরি করত। যদিও গুগল এই বিশেষ প্রশ্ন এবং এর অনুরূপ আরেকটি প্রশ্ন ("লিভার ফাংশন পরীক্ষার স্বাভাবিক মাত্রা কত")-এর জন্য এআই ওভারভিউ সরিয়ে নিয়েছে, গার্ডিয়ান দেখেছে যে সামান্য পরিবর্তন করে প্রশ্নগুলো করলে এখনও এআই উত্তর দিচ্ছে। আজ সকালে গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন প্রকাশের কয়েক ঘণ্টা পর, আমাদের নিজস্ব পরীক্ষায় ঐ পরিবর্তিত প্রশ্নগুলো আর এআই ওভারভিউ দেখাচ্ছিল না, যদিও গুগল "এআই মোডে" প্রশ্নটি পুনরায় লেখার বিকল্প দিচ্ছিল। মজার ব্যাপার হলো, কিছু ক্ষেত্রে শীর্ষ অনুসন্ধানের ফলাফল ছিল গার্ডিয়ানের নিবন্ধটি নিজেই, যা প্রমাণ করে যে তথ্য এবং সংশোধন কত দ্রুত ছড়াতে পারে।
এই ঘটনাটি স্বাস্থ্যসেবায় এআই-এর ভূমিকা এবং প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর তাদের এআই সিস্টেমের নির্ভুলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব নিয়ে মৌলিক প্রশ্ন তুলেছে। বায়োমেডিকেল ইনফরমেটিক্সের অধ্যাপক ড. এমিলি কার্টার বলেন, "এআই একটি শক্তিশালী হাতিয়ার, তবে এটি মানুষের দক্ষতার বিকল্প নয়, বিশেষ করে চিকিৎসার ক্ষেত্রে। যথাযথ যাচাইকরণ এবং তদারকি ছাড়া চিকিৎসা বিষয়ক পরামর্শের জন্য এআই-এর উপর নির্ভর করার বিষয়ে আমাদের খুব সতর্ক হওয়া উচিত।"
এখানে চ্যালেঞ্জ হলো, এআই মডেলগুলোকে চিকিৎসা বিষয়ক জ্ঞানের জটিলতাগুলো বুঝতে এবং মানব স্বাস্থ্যের অন্তর্নিহিত পরিবর্তনশীলতা হিসাব করতে প্রশিক্ষণ দেওয়া। এর জন্য প্রচুর ডেটাতে অ্যাক্সেস থাকার পাশাপাশি সূক্ষ্ম প্যাটার্ন এবং সম্পর্কগুলো সনাক্ত করতে সক্ষম অত্যাধুনিক অ্যালগরিদমও প্রয়োজন। তাছাড়া, ত্রুটিগুলো চিহ্নিত ও সংশোধন করার জন্য ক্রমাগত পর্যবেক্ষণ এবং মূল্যায়ন করা দরকার।
গুগলের একজন মুখপাত্র টেকক্রাঞ্চকে বলেছেন যে, কোম্পানিটি তার এআই ওভারভিউ-এর গুণমান এবং নির্ভুলতা উন্নত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং গার্ডিয়ানের উত্থাপিত সমস্যাগুলো সমাধানে তারা সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। মুখপাত্র আরও বলেন, "আমাদের এআই সিস্টেমগুলো নির্ভরযোগ্য এবং সহায়ক তথ্য প্রদান করে তা নিশ্চিত করার জন্য আমরা ক্রমাগত আমাদের মডেলগুলোকে পরিমার্জন করছি এবং বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে পাওয়া মতামত অন্তর্ভুক্ত করছি।"
ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যসেবায় এআই-এর বিকাশের জন্য প্রযুক্তি কোম্পানি, চিকিৎসা পেশাজীবী এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে একটি যৌথ প্রচেষ্টা প্রয়োজন হবে। এআই সিস্টেমগুলো যেন দায়িত্বশীল ও নৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়, তা নিশ্চিত করার জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশিকা এবং মানদণ্ড প্রয়োজন। তাছাড়া, এআই-এর সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে জনসাধারণকে শিক্ষিত করা এবং অনলাইনে চিকিৎসা বিষয়ক তথ্য খোঁজার সময় সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনাকে উৎসাহিত করা জরুরি। স্বাস্থ্যসেবায় এআই-এর সম্ভাবনা বিশাল, তবে সেই সম্ভাবনা বাস্তবায়নের জন্য নির্ভুলতা, স্বচ্ছতা এবং স্বাস্থ্যকর সংশয়ের প্রতি অঙ্গীকার প্রয়োজন। কিছু চিকিৎসা বিষয়ক প্রশ্নের জন্য এআই ওভারভিউ সরিয়ে নেওয়ার সাম্প্রতিক ঘটনা ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জগুলো এবং রোগীর নিরাপত্তাকে সবার উপরে রাখার গুরুত্বের একটি কঠোর অনুস্মারক।
Discussion
Join the conversation
Be the first to comment