মারাকাইবো হ্রদের ঝিলিমিলি পৃষ্ঠের নিচে একটি অন্ধকার রহস্য ঘনীভূত হচ্ছে। জরাজীর্ণ তেলের ট্যাঙ্কগুলো ভেনেজুয়েলার বিশাল তেল মজুতের ভয়ঙ্কর স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। শিল্প বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মজুতগুলো পৃথিবীর সবচেয়ে দূষিত অপরিশোধিত তেল উৎপাদন করে। এখন, এই কালো সোনা উত্তোলনের জন্য একটি সম্ভাব্য মার্কিন পরিকল্পনা জলবায়ু বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, যা বিশ্ব উষ্ণায়নকে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখার জন্য বিশ্বের অবশিষ্ট কার্বন বাজেটের ১৩% পর্যন্ত গ্রাস করতে পারে।
বিশ্ব গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাস এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে খারাপ প্রভাবগুলো এড়াতে জরুরিভাবে কার্বন নিঃসরণ কমানোর জন্য সংগ্রাম করছে। প্যারিস চুক্তির মতো আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে এবং দেশগুলো সেগুলো পূরণের জন্য নীতি বাস্তবায়নে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। এই প্রচেষ্টার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে "কার্বন বাজেট" - একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রার মধ্যে উষ্ণতাকে সীমাবদ্ধ রেখে বিশ্ব এখনও যে পরিমাণ কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গত করতে পারে। এই বাজেট অতিক্রম করার অর্থ হল ক্রমবর্ধমান গুরুতর পরিণতির সম্মুখীন হওয়া: সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, চরম আবহাওয়া এবং ব্যাপক পরিবেশগত ক্ষতি।
ভেনেজুয়েলার তেল মজুদ, একটি সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি হলেও, একটি উল্লেখযোগ্য জলবায়ু দায়বদ্ধতা। এই মজুদের বিশাল আকারের অর্থ হল এর সম্পূর্ণ ব্যবহার বায়ুমণ্ডলে প্রচুর পরিমাণে কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গত করবে। ক্লাইমেট পার্টনারের একটি বিশেষ বিশ্লেষণে এই মজুদগুলো কাজে লাগানোর জন্য মার্কিন-সমর্থিত পরিকল্পনার সম্ভাব্য প্রভাব প্রকাশ করা হয়েছে। বিশ্লেষণ অনুসারে, ২০৫০ সালের মধ্যে, এই উদ্যোগটি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস লক্ষ্যমাত্রার জন্য বিশ্বের অবশিষ্ট কার্বন বাজেটের এক দশমাংশের বেশি গ্রাস করতে পারে। এই হিসাবটি কঠোর বাস্তবতাকে তুলে ধরে: জীবাশ্ম জ্বালানি উত্তোলন এবং পোড়ানোর প্রতিটি সিদ্ধান্ত, বিশেষ করে ভেনেজুয়েলার তেলের মতো কার্বন-নিবিড় উৎস থেকে, গ্রহটিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দেয়।
এই পরিস্থিতির তাৎপর্য কেবল পরিসংখ্যানের বাইরেও বিস্তৃত। এটি জ্বালানি নীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং একটি বিশ্ব সংকটের মুখে দেশগুলোর নৈতিক দায়িত্ব সম্পর্কে গভীর প্রশ্ন উত্থাপন করে। জ্বালানি সুরক্ষা কি গ্রহের ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলার মতো মূল্যবান? উন্নত দেশগুলো কীভাবে তাদের জলবায়ু অঙ্গীকারের সঙ্গে তাদের জ্বালানি চাহিদা মেলাবে? এগুলো জটিল প্রশ্ন, যার সহজ উত্তর নেই।
প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শীর্ষস্থানীয় জলবায়ু বিজ্ঞানী ডঃ এমিলি কার্টার বলেছেন, "ভেনেজুয়েলার তেল উত্তোলনের সিদ্ধান্তটি স্বল্পমেয়াদী অর্থনৈতিক লাভের একটি ক্লাসিক উদাহরণ, যা দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশগত পরিণতিকে ছাপিয়ে যায়।" "স্বল্প মেয়াদে সস্তা তেলের সুবিধা আকর্ষণীয় মনে হলেও, জলবায়ুগত মূল্য অনেক বেশি। আমাদের পুনর্নবীকরণযোগ্য জ্বালানি উৎসে বিনিয়োগ করা উচিত, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার দ্বিগুণ করা নয়।"
ভেনেজুয়েলার তেল উত্তোলনের সম্ভাবনা জলবায়ু মডেলিং এবং নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে এআই ব্যবহারের চ্যালেঞ্জগুলোকেও তুলে ধরে। বিভিন্ন জলবায়ু পরিস্থিতির প্রভাব, নতুন জীবাশ্ম জ্বালানি মজুদের ব্যবহারের প্রভাবসহ বিভিন্ন বিষয়গুলো অনুমান করার জন্য ক্রমবর্ধমানভাবে এআই অ্যালগরিদম ব্যবহার করা হয়। তবে, এই মডেলগুলো শুধুমাত্র সেই ডেটার ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যা দিয়ে এগুলোকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। যদি ডেটা অসম্পূর্ণ বা পক্ষপাতদুষ্ট হয়, তবে মডেলগুলো ভুল বা বিভ্রান্তিকর ফলাফল তৈরি করতে পারে। উপরন্তু, এআই অ্যালগরিদমগুলো কখনও কখনও বিদ্যমান পক্ষপাতগুলোকে আরও শক্তিশালী করতে পারে, যার ফলে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে যা দুর্বল জনগোষ্ঠীর জন্য disproportionately ক্ষতিকর।
সামনে তাকালে, বিশ্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ পছন্দের মুখোমুখি। আমরা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতার পথ ধরে চলতে পারি, যা বিপর্যয়কর জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি তৈরি করবে, অথবা আমরা পুনর্নবীকরণযোগ্য জ্বালানি দ্বারা চালিত একটি টেকসই ভবিষ্যৎ গ্রহণ করতে পারি। ভেনেজুয়েলার তেল উত্তোলনের সিদ্ধান্ত জলবায়ু কার্যক্রমের প্রতি আমাদের অঙ্গীকারের একটি পরীক্ষা। এটি একটি অনুস্মারক যে আমরা যে প্রতিটি পছন্দ করি, তেলের প্রতিটি ব্যারেল পোড়াই, তার গ্রহ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পরিণতি রয়েছে। ভবিষ্যৎ আমাদের স্বল্পমেয়াদী লাভের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার এবং একটি পরিচ্ছন্ন, আরও ন্যায়সঙ্গত বিশ্ব গড়ে তোলার জন্য দায়িত্বশীলতার সঙ্গে প্রযুক্তির শক্তিকে কাজে লাগানোর ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে।
Discussion
Join the conversation
Be the first to comment