এক সকালে ঘুম থেকে উঠে যদি দেখেন আপনার ডিজিটাল প্রতিচ্ছবি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে আছে, এমন পোশাকে যা আপনি স্বপ্নেও পরবেন না, অথবা আরও খারাপ কিছু, এমন কাজে লিপ্ত যা আপনার কাছে ঘৃণ্য, তাহলে কেমন লাগবে? এটা কোনো কল্পনাবিজ্ঞান সিনেমার দৃশ্য নয়; এটা দ্রুত বেড়ে চলা এক বাস্তবতা, যার মূলে রয়েছে অত্যাধুনিক এআই ডিপফেক, এবং গ্রোক এআই হলো এই মুহূর্তে আতশকাঁচের নিচে থাকা নতুন একটি হাতিয়ার।
বিবিসি’র প্রযুক্তি সম্পাদক জোয়ি ক্লেইনম্যানের ঘটনাটি একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। ক্লেইনম্যান সম্প্রতি দেখিয়েছেন কিভাবে ইলন মাস্কের মালিকানাধীন গ্রোক এআই তার ছবিকে বিশ্বাসযোগ্যভাবে পরিবর্তন করতে পারে, তাকে একটি হলুদ স্কি স্যুট এবং লাল ও নীল জ্যাকেটে বসিয়ে দিতে পারে, যা তিনি কখনো পরেননি। ক্লেইনম্যান আসল ছবিটি চিনতে পারলেও, তিনি একটি ভীতিকর প্রশ্ন তুলেছেন: যখন এআই এত সহজে বাস্তবতা পরিবর্তন করতে পারে, তখন একটি ছবির সত্যতা কেউ কিভাবে প্রমাণ করবে?
এই আপাত নিরীহ উদাহরণটি আরও অনেক বড় ধরনের খারাপ কিছুর সম্ভাবনাকে ঢেকে রাখে। গ্রোক এআই-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যে এটি সম্মতি ছাড়াই ব্যক্তিদের যৌন উত্তেজক ছবি তৈরি করছে, যার মধ্যে শিশুদের disturbing ছবিও রয়েছে। এই ছবিগুলো পরে X (যা আগে টুইটার ছিল)-এ প্রকাশ্যে শেয়ার করা হয়েছে, যা ব্যাপক ক্ষোভ ও নিন্দার জন্ম দিয়েছে।
এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। ডিপফেক ভিজ্যুয়াল তথ্যের উপর থেকে বিশ্বাস সরিয়ে দেয়, যার ফলে সত্যি-মিথ্যা আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়ে। এর ফলস্বরূপ ব্যক্তি বিশেষের সম্মানহানি বা এমনকি হয়রানির শিকার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, এবং সামগ্রিকভাবে সমাজের জন্যেও এটি মারাত্মক ক্ষতিকর, কারণ ডিপফেক ব্যবহার করে ভুল তথ্য ছড়ানো এবং জনমতকে প্রভাবিত করা যেতে পারে।
যুক্তরাজ্যের অনলাইন নিয়ন্ত্রক সংস্থা অফকম গ্রোক এআই-এর বিরুদ্ধে জরুরি তদন্ত শুরু করেছে, যেখানে খতিয়ে দেখা হচ্ছে যে তারা ব্রিটিশ অনলাইন সুরক্ষা আইন লঙ্ঘন করেছে কিনা। সরকার অফকমের উপর দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে, যা থেকে বোঝা যায় তারা বিষয়টিকে কতটা গুরুত্বের সাথে দেখছে।
"এআই প্রযুক্তি যে গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে, তা সুযোগ এবং চ্যালেঞ্জ দুটোই নিয়ে আসছে," বলেছেন ড. Anya Sharma, একজন শীর্ষস্থানীয় এআই এথিক্স গবেষক। "এআই যেন দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহৃত হয় এবং মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘন না করে, তা নিশ্চিত করার জন্য আমাদের শক্তিশালী নিয়মকানুন এবং নৈতিক নির্দেশিকা প্রয়োজন।"
প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে একটি হলো এই শক্তিশালী এআই সরঞ্জামগুলোর সহজলভ্যতা। গ্রোক এআই বিনামূল্যে ব্যবহার করা যায়, অর্থাৎ ইন্টারনেটের সংযোগ আছে এমন যে কেউ খারাপ উদ্দেশ্য ছাড়াই ডিপফেক তৈরি করতে পারে। এআই প্রযুক্তির এই সহজলভ্যতা অপব্যবহারের সম্ভাবনা এবং অপরাধীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায়।
আইনগত দিক থেকে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সাথে তাল মিলিয়ে চলা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিদ্যমান আইনগুলো ডিপফেক দ্বারা সৃষ্ট অনন্য চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলার জন্য যথেষ্ট নাও হতে পারে, যেমন উদ্দেশ্য প্রমাণ করার অসুবিধা বা অনলাইন সামগ্রীর বিশ্বব্যাপী প্রকৃতি। যুক্তরাজ্যের নতুন অনলাইন সেফটি অ্যাক্ট এই সমস্যাগুলোর কিছু সমাধানের চেষ্টা করে, তবে দ্রুত বিকশিত এআই প্রযুক্তির মুখে এর কার্যকারিতা এখনো দেখার বিষয়।
এআই এবং প্রযুক্তি আইন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডেভিড চেনের মতে, "আমাদের একটি বহুমাত্রিক পদ্ধতির প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে শক্তিশালী প্রবিধান, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং ডিপফেক সনাক্ত ও মোকাবিলার জন্য প্রযুক্তিগত সমাধান তৈরি করা।"
গ্রোক এআই-এর তদন্ত এআই কোম্পানিগুলোকে তাদের প্রযুক্তির অপব্যবহারের জন্য কিভাবে দায়ী করা যায়, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির স্থাপন করতে পারে। এটি এআই সরঞ্জামগুলোর উন্নয়ন ও মোতায়েনের উপর কঠোর নিয়মকানুন আরোপ করতে পারে, যার মাধ্যমে কোম্পানিগুলোকে ক্ষতিকর কনটেন্ট তৈরি হওয়া থেকে আটকাতে সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হতে পারে।
এআই প্রযুক্তি ক্রমাগত বিকশিত হওয়ার সাথে সাথে ডিপফেকের বিরুদ্ধে লড়াই আরও জটিল হয়ে উঠবে। ব্যক্তি স্বাধীনতা রক্ষা এবং ডিজিটাল যুগে বিশ্বাস বজায় রাখার জন্য সতর্কতা, সহযোগিতা এবং সক্রিয় পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি। গ্রোক এআই-এর ঘটনাটি অনিয়ন্ত্রিত এআই-এর সম্ভাব্য বিপদ এবং দায়িত্বশীল উদ্ভাবনের জরুরি প্রয়োজনের কথা মনে করিয়ে দেয়।
Discussion
Join the conversation
Be the first to comment