ইয়েমেনের মা নাওয়াল আল-মাগাফি সাত মাস ধরে অসহনীয় নীরবতা সহ্য করেছেন। তার ছেলে, আরও অসংখ্য মানুষের মতো, ইয়েমেনের নৃশংস গৃহযুদ্ধের ছায়ায় অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) এবং মিত্র বাহিনী দ্বারা পরিচালিত গোপন কারাগারের একটি নেটওয়ার্কে হারিয়ে গিয়েছিল। তার গল্প, অগণিত ইয়েমেনি পরিবারের কষ্টের প্রতিচ্ছবি, এখন বিবিসির অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। বিবিসি এসব বন্দিশিবিরে প্রবেশ করে দীর্ঘদিনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে।
ইয়েমেনের দশক-ব্যাপী গৃহযুদ্ধ আঞ্চলিক ক্ষমতা, গোষ্ঠীগত বিভাজন এবং নজিরবিহীন মানবিক সংকট দিয়ে গঠিত। এই সংঘাত সৌদি আরবের সমর্থনপুষ্ট আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকারের বিরুদ্ধে হুথি বিদ্রোহীদের, যারা উত্তর-পশ্চিমের বেশিরভাগ অংশ নিয়ন্ত্রণ করে তাদের মধ্যে চলছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রথমে হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার ছিল। তবে দেশটির দক্ষিণে একটি বিতর্কিত ভূমিকা পালন করেছে। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই এবং সরকারকে সমর্থন করা সত্ত্বেও, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং এর ইয়েমেনি মিত্রদের দ্বারা পরিচালিত গোপন কারাগার থাকার অভিযোগ উঠেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত দীর্ঘদিন ধরে এই অভিযোগ অস্বীকার করলেও বিবিসির তদন্তে এখন তা প্রমাণিত।
বিবিসির দল, যার নেতৃত্বে ছিলেন সিনিয়র আন্তর্জাতিক তদন্ত বিষয়ক সংবাদদাতা নাওয়াল আল-মাগাফি এবং লিয়াম ওয়েইর, তারা দক্ষিণ ইয়েমেনের সাবেক ইউএই সামরিক ঘাঁটিতে অবস্থিত বন্দিশিবিরে প্রবেশ করেন। সেখানে তারা মানবাধিকারের প্রতি অবজ্ঞা এবং পদ্ধতিগত নির্যাতনের এক ভয়াবহ চিত্র দেখতে পান। একটি সাইটে, শিপিং কন্টেইনারগুলিকে অস্থায়ী সেল হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছিল, যেখানে ন্যূনতম বায়ুচলাচল সহ শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে প্রায় ৬০ জন বন্দীকে রাখা হয়েছিল। ধাতব দেয়ালে নাম ও তারিখ খোদাই করা ছিল, যা বন্দিদের অস্তিত্ব এবং মুক্তির আকুলতার প্রমাণ। একজন প্রাক্তন বন্দী মারধর ও যৌন নির্যাতনের লোমহর্ষক কাহিনি বর্ণনা করেছেন, যা অকল্পনীয় কষ্টের চিত্র তুলে ধরে। বিবিসি দল নিজের চোখে এসব অভিযোগের প্রমাণ দেখেছে, যেখানে তারা দুর্বিষহ পরিস্থিতি এবং বন্দিদের চোখেমুখে ভয়ের ছাপ দেখতে পেয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত ধারাবাহিকভাবে এই ধরনের কারাগারের অস্তিত্ব অস্বীকার করেছে এবং এই সর্বশেষ অনুসন্ধানের বিষয়ে বিবিসির মন্তব্যের অনুরোধের কোনও জবাব দেয়নি। তবে, বিবিসির উপস্থাপিত প্রমাণ অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতো মানবাধিকার সংস্থাগুলির পূর্ববর্তী প্রতিবেদনের সঙ্গে মিলে যায়, যেখানে অনুরূপ নির্যাতনের নথিভুক্ত করা হয়েছে। এই সংস্থাগুলি দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের জবাবদিহিতার আহ্বান জানিয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের নীরবতা এবং ক্রমবর্ধমান প্রমাণ তাদের মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি প্রতিশ্রুতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
ইয়েমেনি সরকার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে জোট ভেঙে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত চলতি বছরের জানুয়ারির শুরুতে ইয়েমেন থেকে তাদের সেনা প্রত্যাহার করে নেওয়ায় দক্ষিণাঞ্চলে একটি ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়েছে, যা বিদ্যমান অস্থিরতাকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের সুযোগ তৈরি করতে পারে। ইয়েমেনি সরকার, যা ইতিমধ্যেই নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে সংগ্রাম করছে, এখন এই গোপন কারাগারগুলোর উত্তরাধিকার মোকাবেলা এবং অতীতের নির্যাতনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
বিবিসির তদন্তের এই উদ্ঘাটন ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধের মানবিক মূল্য সম্পর্কে একটি কঠোর অনুস্মারক। ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ এবং আঞ্চলিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব সংবাদপত্রের শিরোনাম দখল করে রাখলেও, নাওয়াল আল-মাগাফি এবং তার ছেলের মতো ব্যক্তিদের গল্পই সংঘাতের ট্র্যাজেডিকে তুলে ধরে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ জড়িত সকল পক্ষের কাছে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা দাবি করতে হবে এবং একটি স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার দিকে কাজ করতে হবে, যা সকল ইয়েমেনির অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করে। অতীতের ক্ষতগুলো নিরাময় এবং ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধার উপর ভিত্তি করে একটি সমাজ গড়ে তোলার ওপর ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।
Discussion
Join the conversation
Be the first to comment