একটি নতুন মানচিত্র অভূতপূর্ব বিশদভাবে অ্যান্টার্কটিকার বরফের নিচে লুকানো ভূখণ্ড প্রকাশ করেছে, বিজ্ঞানীরা মনে করছেন এই আবিষ্কার হিমশীতল মহাদেশ সম্পর্কে ধারণা উন্নত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। গবেষকরা উপগ্রহের ডেটা এবং অ্যান্টার্কটিকার হিমবাহগুলোর গতিবিধি সংক্রান্ত পদার্থবিদ্যা ব্যবহার করে মহাদেশটির লুকানো বৈশিষ্ট্যগুলো বের করেছেন।
এই প্রচেষ্টায় পূর্বে অজানা কয়েক হাজার টিলা ও শৈলশিরার প্রমাণ পাওয়া গেছে এবং অ্যান্টার্কটিকার লুকানো কিছু পর্বতশ্রেণীর আগের চেয়ে স্পষ্ট মানচিত্র তৈরি করা হয়েছে। গ্রেনোবল-আল্পস বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান গবেষক ডঃ হেলেন ওকেন্ডেন বিবিসি নিউজকে বলেছেন, বিস্তারিত তথ্যের এই উন্নতি অনেকটা "পুরোনো দিনের খারাপ মানের পিক্সেলযুক্ত ফিল্ম ক্যামেরা থেকে সরাসরি জুম করা একটি ডিজিটাল ছবিতে রূপান্তরিত হওয়ার মতো, যেখানে সবকিছু স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।"
এই মানচিত্র তৈরি করার ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিশেষ করে মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদম ব্যবহার করা হয়েছে। উপগ্রহ থেকে পাওয়া বিশাল ডেটা এবং বরফের চলন প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করতে এটি কাজে লেগেছে। এই অ্যালগরিদমগুলো ভূপৃষ্ঠের বৈশিষ্ট্য এবং এর নিচের ভূ-সংস্থানের মধ্যে সম্পর্ক নির্ণয় করতে প্রশিক্ষিত, যা বরফের নিচে লুকানো জমির আকার সনাক্ত করতে ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতির চেয়ে বেশি নির্ভুল। এই প্রক্রিয়ায় এআই সিস্টেমকে বিদ্যমান ডেটা সরবরাহ করা হয়, যেখানে ভূপৃষ্ঠ এবং ভূগর্ভ উভয়ই পরিচিত। এর মাধ্যমে এআই সম্পর্কগুলো শিখে নেয় এবং যেসব জায়গায় ভূগর্ভ লুকানো, সেখানেও এটি প্রয়োগ করতে পারে।
এই বিস্তারিত মানচিত্র জলবায়ু পরিবর্তন গবেষণার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। বরফের নিচে থাকা শিলাস্তরের আকার হিমবাহের প্রবাহ এবং উষ্ণ সমুদ্রের জলের কারণে বরফ গলার প্রবণতাকে প্রভাবিত করে। ভূ-সংস্থান সম্পর্কে ধারণা থাকলে বিজ্ঞানীরা বরফের স্তরের আচরণ সম্পর্কে আরও নির্ভুল মডেল তৈরি করতে পারবেন এবং আত্মবিশ্বাসের সাথে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির পূর্বাভাস দিতে পারবেন। উদাহরণস্বরূপ, নতুন আবিষ্কৃত টিলা এবং শৈলশিরাগুলো বরফের প্রবাহের জন্য বাধা বা চ্যানেল হিসেবে কাজ করতে পারে, যা সমুদ্রে বরফ নির্গমনের হারকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করবে।
মানচিত্রে কিছু অনিশ্চয়তা থাকা সত্ত্বেও, গবেষকরা আত্মবিশ্বাসী যে নতুন তথ্যগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অ্যান্টার্কটিকার প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে আলোকপাত করবে। ভূগর্ভের দৃশ্যের উন্নতির ফলে বরফের স্তরের স্থিতিশীলতা এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে এর অবদান সম্পর্কে আরও ভালোভাবে অনুমান করা যাবে। নীতিনির্ধারক এবং উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জন্য এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তারা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সম্ভাব্য প্রভাবের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এই প্রকল্পটি মেরু বিজ্ঞান গবেষণায় এআই ব্যবহারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। মেশিন লার্নিংয়ের ক্ষমতা ব্যবহার করে গবেষকরা একটি মহাদেশকে অধ্যয়ন করার চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছেন, যা বেশিরভাগটাই দৃষ্টির বাইরে লুকানো। ভবিষ্যতে রাডার জরিপ এবং ভূকম্পন পরিমাপের মতো অন্যান্য উৎস থেকে ডেটা অন্তর্ভুক্ত করে মানচিত্রগুলোকে আরও পরিমার্জিত এবং অনিশ্চয়তা কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে। অ্যান্টার্কটিকার লুকানো ভূখণ্ডকে মানচিত্রায়িত করার চলমান প্রচেষ্টা আমাদের গ্রহের গোপন রহস্য উন্মোচন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে আমাদের প্রতিক্রিয়া জানানোর ক্ষেত্রে এআই-এর শক্তির একটি প্রমাণ।
Discussion
Join the conversation
Be the first to comment