বৈশ্বিক অর্থনীতির ভিত্তি একটি কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন। ওয়াশিংটন ডিসি থেকে আঙ্কারা পর্যন্ত, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা – এই ধারণা যে এই প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত থাকবে – ক্রমবর্ধমান যাচাই-বাছাইয়ের অধীনে রয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) একটি কঠোর সতর্কবার্তা জারি করেছে: এই স্বাধীনতা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং প্রবৃদ্ধির জন্য "অপরিহার্য"।
আইএমএফ-এর এই বিবৃতিটি এমন এক সংবেদনশীল সময়ে এসেছে। গত সপ্তাহেই, ইউএস ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ার জেরোম পাওয়েল ফেডের বিল্ডিং সংস্কার সংক্রান্ত তার সাক্ষ্যের বিষয়ে একটি নজিরবিহীন ফৌজদারি তদন্তের কথা প্রকাশ করেছেন। পাওয়েল ইঙ্গিত দিয়েছেন যে এই তদন্তের সূত্রপাত সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ফেডের সুদের হার নীতি নিয়ে অসন্তোষ থেকে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসনকে দুর্বল করার জন্য রাজনৈতিক চাপের সম্ভাবনাকে তুলে ধরে। যদিও ট্রাম্প তদন্তের বিষয়ে কোনো খবর জানেন না বলে জানিয়েছেন, তবে এই ঘটনা একটি ক্রমবর্ধমান উদ্বেগকে তুলে ধরে: কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো কি সত্যিই রাজনৈতিক প্রভাব থেকে সুরক্ষিত?
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা কেবল একটি বিমূর্ত ধারণা নয়; এটি আধুনিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার একটি ভিত্তিপ্রস্তর। এর যুক্তিটি সহজ: রাজনীতিবিদরা, প্রায়শই স্বল্পমেয়াদী নির্বাচনী চক্র দ্বারা চালিত হয়ে, নির্বাচনের আগে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে চাঙা করতে সুদের হার কমানোর মতো তাৎক্ষণিক লাভের জন্য মুদ্রানীতিকে প্রভাবিত করতে প্রলুব্ধ হতে পারেন। এর ফলে টেকসই নয় এমন তেজিভাব দেখা যেতে পারে, যার পরে বেদনাদায়ক মন্দা নেমে আসতে পারে, যা জনগণের আস্থা কমিয়ে দেয় এবং অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করে তোলে। একটি স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক, এই চাপগুলো থেকে সুরক্ষিত থেকে, দীর্ঘমেয়াদী মূল্য স্থিতিশীলতা এবং টেকসই প্রবৃদ্ধির দিকে মনোযোগ দিতে পারে।
আইএমএফ-এর এই সতর্কবার্তাটি তাদের সর্বশেষ বিশ্ব অর্থনৈতিক আউটলুকের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত, যা বিশ্ব অর্থনীতির একটি বিস্তৃত মূল্যায়ন। প্রতিবেদনটি "স্থিতিশীল" প্রবৃদ্ধির চিত্র তুলে ধরলেও, এ বছর ৩.৩% এবং ২০২৭ সালে ৩.২% সম্প্রসারণের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, তবে এটি পরিবর্তনশীল বাণিজ্য নীতির কারণে সৃষ্ট প্রতিকূলতাকেও স্বীকার করে। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাজ্যের ২০২৫ সালে ১.৪% প্রবৃদ্ধি হতে পারে বলে অনুমান করা হয়েছে, যা আগের পূর্বাভাসের চেয়ে সামান্য বেশি। তবে, প্রতিবেদনে জোর দেওয়া হয়েছে যে এই অনুমানগুলো একটি স্থিতিশীল এবং অনুমানযোগ্য অর্থনৈতিক পরিবেশ বজায় রাখার উপর নির্ভরশীল, যা আবার স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর উপর নির্ভরশীল।
লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্সের অর্থনীতিবিদ ড. Anya Sharma, যিনি মুদ্রানীতিতে বিশেষজ্ঞ, ব্যাখ্যা করেন, "কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা কোনো টেকনোক্র্যাটদের উপর অর্পিত কোনো উপহার নয়।" "এটি একটি কঠিন অর্জিত সাফল্য, যা কয়েক দশকের অভিজ্ঞতা এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের বিপদ সম্পর্কে গভীর ধারণার উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে। যখন রাজনীতিবিদরা মুদ্রানীতিকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন, তখন তারা আগুনের সঙ্গে খেলেন।"
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতার প্রতি চ্যালেঞ্জগুলো কেবল যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। উদাহরণস্বরূপ, তুরস্কে, প্রেসিডেন্ট রেজেপ তাইয়েপ এরদোয়ান কর্তৃক মুদ্রানীতি সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলোতে বারবার হস্তক্ষেপের কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশ্বাসযোগ্যতা হ্রাস পেয়েছে এবং উচ্চ মুদ্রাস্ফীতিতে অবদান রেখেছে। একইভাবে, কিছু উদীয়মান অর্থনীতিতে, সরকারগুলোকে বাজেট ঘাটতি পূরণের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর উপর চাপ সৃষ্টি করতে দেখা গেছে, যা মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে তাদের ক্ষমতাকে দুর্বল করে।
আইএমএফ-এর বার্তা স্পষ্ট: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা রক্ষা করা কেবল পৃথক দেশগুলোর বিষয় নয়; এটি একটি বৈশ্বিক অপরিহার্যতা। যেহেতু বিশ্ব অর্থনীতি বাণিজ্য উত্তেজনা থেকে শুরু করে প্রযুক্তিগত বিপর্যয় পর্যন্ত জটিল চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে, তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্থিতিশীলতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাদের স্বাধীনতাকে দুর্বল করা কেবল অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার ঝুঁকিই বাড়ায় না, সেই সাথে আমাদের আর্থিক ব্যবস্থাকে সমর্থনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর জনগণের আস্থা হ্রাস করে। রাজনৈতিক সুবিধা এবং জনতুষ্টিবাদের চাপ এই গুরুত্বপূর্ণ নীতিকে প্রতিহত করতে পারবে কিনা, তা আগামী বছরগুলোতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হবে।
Discussion
Join the conversation
Be the first to comment