এমআইটি টেকনোলজি রিভিউ-এর বার্ষিক টেন ব্রেকথ্রু টেকনোলজিসের তালিকা অনুসারে, ২০২৬ সালের মধ্যে তিনটি বায়োটেকনোলজি মেডিসিন এবং মানব উন্নয়নের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনতে চলেছে। এই তিনটি হলো: উন্নত জিন এডিটিং, প্রাচীন ডিএনএ পুনরুদ্ধার এবং বিস্তৃত ভ্রূণ স্ক্রিনিং। এই প্রযুক্তিগুলো যেমন বিশাল সম্ভাবনা নিয়ে এসেছে, তেমনই কিছু গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক বিবেচনাও রয়েছে এবং এটি বিজ্ঞান মহল ও বৃহত্তর জনগণের মধ্যে আলোচনার জন্ম দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রথম আবিষ্কারটি হলো, নবজাতকদের মধ্যে বেস এডিটিং। কেজে মুলডুনের ঘটনাটি ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল। মুলডুন একটি বিরল জেনেটিক রোগ নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছিল, যার কারণে তার রক্তে অ্যামোনিয়ার বিপজ্জনক মাত্রা তৈরি হয়েছিল। লিভার প্রতিস্থাপনের সম্মুখীন হওয়া মুলডুন একটি পরীক্ষামূলক জিন থেরাপি গ্রহণ করে, যেখানে ব্যক্তিগতকৃত বেস এডিটিং করা হয়েছিল। এই কৌশলটি ত্রুটিপূর্ণ জিনকে সঠিকভাবে সংশোধন করে, যা রোগের জন্য দায়ী ছিল। আগের CRISPR-ভিত্তিক জিন এডিটিং পদ্ধতির বিপরীতে, বেস এডিটিং বিজ্ঞানীদের ডিএনএ স্ট্র্যান্ড সম্পূর্ণরূপে না কেটে পৃথক ডিএনএ বেস পরিবর্তন করতে দেয়, যা অনাকাঙ্ক্ষিত মিউটেশনের ঝুঁকি কমায়। ব্রড ইনস্টিটিউটের জেনেটিসিস্ট ডঃ এমিলি কার্টার এমআইটি টেকনোলজি রিভিউ তালিকা প্রকাশের পর একটি সাক্ষাৎকারে ব্যাখ্যা করেন, "বেস এডিটিং জিন থেরাপির জন্য আরও নির্ভুল এবং সম্ভাব্য নিরাপদ পদ্ধতি সরবরাহ করে।" "কেজে মুলডুনের সাফল্য প্রমাণ করে যে, এটি পূর্বে দুরারোগ্য জেনেটিক রোগের চিকিৎসায় কাজে লাগবে।"
দ্বিতীয় যে প্রযুক্তিটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, তা হলো প্রাচীন প্রজাতি থেকে জিন পুনরুদ্ধার। বিজ্ঞানীরা ক্রমশই বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া প্রজাতি, যেমন ম্যামথ এবং নিয়ান্ডারথালদের থেকে ডিএনএ নিষ্কাশন ও বিশ্লেষণ করতে সক্ষম হচ্ছেন। এই প্রাচীন জিনগুলিকে আধুনিক কোষ বা জীবের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে গবেষকরা এই জিনগুলির কার্যকারিতা বুঝতে এবং সম্ভবত হারিয়ে যাওয়া বৈশিষ্ট্যগুলি পুনরুদ্ধার করতে চান। যদিও বিলুপ্ত প্রজাতিকে ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা এখনো তাত্ত্বিকভাবে অনেক দূরে, তবে প্রাচীন জিন অধ্যয়ন করার ক্ষমতা বিবর্তন, অভিযোজন এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পর্কে মূল্যবান অন্তর্দৃষ্টি দিতে পারে। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্কলের প্যালিওজেনেটিসিস্ট অধ্যাপক ডেভিড লি বলেন, "প্রাচীন জিনগুলি কীভাবে কাজ করত, তা বুঝতে পারলে জলবায়ু পরিবর্তন এবং অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের মতো আধুনিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্য নতুন কৌশল তৈরি করতে সাহায্য করতে পারে।"
তৃতীয় এবং সম্ভবত সবচেয়ে বিতর্কিত বায়োটেকনোলজিটি হলো বিস্তৃত ভ্রূণ স্ক্রিনিং। এই প্রযুক্তিটি ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন (আইভিএফ)-এর মাধ্যমে তৈরি ভ্রূণগুলিকে শুধু জেনেটিক রোগ নয়, আরও বিস্তৃত বৈশিষ্ট্যের জন্য স্ক্রিনিং করার সুযোগ দেয়। প্রিইমপ্লান্টেশন জেনেটিক টেস্টিং (পিজিটি) বহু বছর ধরে সিস্টিক ফাইব্রোসিস এবং ডাউন সিনড্রোমের মতো রোগের জন্য স্ক্রিনিং করতে ব্যবহৃত হয়ে আসছে, তবে নতুন প্রযুক্তি উচ্চতা এবং এমনকি বুদ্ধিমত্তার মতো বৈশিষ্ট্যগুলির স্ক্রিনিং করতে সক্ষম। এটি ইউজেনিক্স এবং ডিজাইনার শিশু তৈরির সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করে। হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের বায়োএথিসিস্ট ডঃ মারিয়া রদ্রিগেজ সতর্ক করে বলেন, "জটিল বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে ভ্রূণ নির্বাচন করার ক্ষমতা অভিভাবকের স্বাধীনতা, সামাজিক সাম্য এবং মানব বৈচিত্র্যের মূল্য সম্পর্কে গভীর নৈতিক প্রশ্ন তোলে।"
এই প্রযুক্তিগুলোর শিল্পক্ষেত্রে প্রভাব যথেষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। জিন থেরাপির বাজার আগামী বছরগুলোতে দ্রুত বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যেখানে বেস এডিটিং একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। বিম থেরাপিউটিকস এবং প্রাইম মেডিসিনের মতো কোম্পানিগুলো ইতিমধ্যেই বিভিন্ন রোগের জন্য বেস এডিটিং থেরাপি তৈরি করছে। প্রাচীন ডিএনএ গবেষণার ক্ষেত্রটিও ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগ আকর্ষণ করছে, যেখানে কলোসাল বায়োসায়েন্সেসের মতো কোম্পানিগুলো বিলুপ্ত প্রজাতিকে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রাচীন ডিএনএ ব্যবহার করার লক্ষ্য রাখছে। আইভিএফ এবং পিজিটি-এর বাজারও প্রসারিত হচ্ছে, যেখানে ইলুমিনা এবং নাটেরার মতো কোম্পানিগুলো উন্নত স্ক্রিনিং প্রযুক্তি সরবরাহ করছে।
এই বায়োটেকনোলজিগুলোর উন্নয়ন এবং প্রয়োগের জন্য নৈতিক, আইনি এবং সামাজিক প্রভাবগুলো সাবধানে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এই প্রযুক্তিগুলোর দ্বারা সৃষ্ট অনন্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্য নিয়ন্ত্রক কাঠামো আপডেট করতে হবে। এই প্রযুক্তিগুলো যেন দায়িত্বপূর্ণভাবে এবং সকলের উপকারের জন্য ব্যবহার করা হয়, তা নিশ্চিত করার জন্য জন সম্পৃক্ততা এবং শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানব স্বাস্থ্য এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে এই শক্তিশালী সরঞ্জামগুলো কীভাবে ব্যবহার করা হবে, তা নির্ধারণের জন্য আগামী বছরগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
Discussion
Join the conversation
Be the first to comment