দাভোসের সম্মেলন কক্ষে চাপা উত্তেজনা স্পষ্ট ছিল। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি যখন মঞ্চে উঠলেন, তখন বিশ্বনেতা, অর্থনীতিবিদ ও সাংবাদিকরা ঝুঁকে বসেছিলেন। এরপর যা ঘটল, তা সতর্কভাবে বাছাই করা শব্দের வழக்கமான কূটনৈতিক নৃত্য ছিল না, বরং একটি কঠোর ঘোষণা ছিল: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী বিশ্ব ব্যবস্থা, যা পারস্পরিক সমৃদ্ধি ও সহযোগিতার ভিত্তিতে তৈরি হয়েছিল, তা ভেঙে পড়ছে। মূলত, কার্নি ঘোষণা করেছিলেন যে আমরা যেমন বিশ্বকে জানি, তার শেষ হতে চলেছে।
এই সপ্তাহে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে কার্নির দেওয়া ভাষণ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। কয়েক দশক ধরে, আমেরিকান নেতৃত্বে গঠিত বিশ্ব ব্যবস্থা আপেক্ষিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়িয়েছে। কিন্তু জাতীয়তাবাদী মনোভাবের উত্থান, সংরক্ষণবাদী বাণিজ্য নীতি এবং আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলির প্রতি ক্রমবর্ধমান অবজ্ঞা, যেমন ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকাণ্ডে দেখা গেছে, এই ব্যবস্থার ভিত্তি দুর্বল করে দিয়েছে।
"আমরা একটি ক্রান্তিকালে দাঁড়িয়ে আছি," কার্নি বলেন, তার কণ্ঠ পুরো হল জুড়ে অনুরণিত হচ্ছিল। "যে নীতিগুলি প্রজন্ম ধরে আমাদের পথ দেখিয়েছে, সেগুলোকে চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছে এবং নিষ্ক্রিয়তার পরিণতি ভয়াবহ।" তিনি ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য যুদ্ধ, বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলির ক্ষয় এবং ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ব্যবধানকে একটি সংকটপূর্ণ ব্যবস্থার প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
কানাডা, যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের মিত্র, নিজেকে একটি বিপজ্জনক অবস্থানে খুঁজে পেয়েছে। তার দক্ষিণের প্রতিবেশীর সাথে ঐতিহাসিক সম্পর্ক এবং একটি নিয়ম-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রতি তার অঙ্গীকারের মধ্যে আটকা পড়ে দেশটি এখন সক্রিয়ভাবে তার অংশীদারিত্বকে প্রসারিত করতে এবং তার নিজস্ব অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে শক্তিশালী করতে চাইছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রী ক্রিস্টিয়া ফ্রিল্যান্ড পরবর্তী একটি সাক্ষাৎকারে বলেন, "আমরা কেবল চুপ করে বসে থাকতে পারি না যখন বিশ্ব বিশৃঙ্খলার দিকে যাচ্ছে।" "গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মূল্যবোধ সমুন্নত রাখার দায়িত্ব কানাডার রয়েছে, এমনকি যখন অন্যরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।"
কানাডার পররাষ্ট্রনীতির এই পরিবর্তন চ্যালেঞ্জমুক্ত নয়। বাণিজ্য সম্পর্ককে প্রসারিত করা, নতুন জোট তৈরি করা এবং দেশীয় অবকাঠামোতে বিনিয়োগের জন্য যথেষ্ট সম্পদ এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন। তাছাড়া, আমেরিকান প্রভাবকে প্রতিরোধের যেকোনো প্রচেষ্টা একটি শক্তিশালী প্রতিবেশীকে ক্ষুব্ধ করতে পারে এবং গভীরভাবে সমন্বিত সরবরাহ ব্যবস্থাকে ব্যাহত করতে পারে।
টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. সারাহ হিউজ ব্যাখ্যা করেন, "এটি একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষার কাজ।" "যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কোনওরকম প্রতিক্রিয়া তৈরি না করে কানাডাকে তার নিজস্ব স্বার্থ রক্ষা করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন সতর্ক কূটনীতি, কৌশলগত বিনিয়োগ এবং কানাডার মূল্যবোধের একটি স্পষ্ট ব্যাখ্যা।"
কানাডিয়ান সরকার একটি বহুমুখী পদ্ধতি অনুসরণ করছে। এটি এশিয়া, ইউরোপ এবং লাতিন আমেরিকার দেশগুলির সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদার করতে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। এটি তার প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে এবং আমেরিকান সরবরাহ ব্যবস্থার উপর নির্ভরতা কমাতে অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগ করছে। এবং এটি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা এবং জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সংস্কার ও শক্তিশালী করতে সমমনা দেশগুলোর সাথে কাজ করছে।
কার্নি স্পষ্ট করে বলেন, "আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আমাদের সম্পর্ক ত্যাগ করছি না।" "তবে আমরা আমাদের মূল্যবোধ বা আমাদের স্বার্থের সাথে আপস করতেও রাজি নই। আমরা বিশ্বাস করি একটি শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ কানাডা একটি স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ বিশ্বের জন্য অপরিহার্য।"
ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। এই নতুন বিশ্ব ব্যবস্থায় কানাডার প্রচেষ্টা সফল হবে কিনা, তা দেখার বিষয়। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট: প্রশ্নাতীত আমেরিকান নেতৃত্বের যুগ শেষ, এবং বিশ্ব একটি গভীর পরিবর্তনের মধ্যে প্রবেশ করছে। কার্নির নেতৃত্বে কানাডা নিজেকে এই নতুন বাস্তবতায় টিকে থাকার জন্য নয়, উন্নতি লাভের জন্য প্রস্তুত করছে। এই প্রচেষ্টার সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তববাদিতার সাথে নীতির ভারসাম্য বজায় রাখার এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে একটি নতুন পথ তৈরি করার ক্ষমতার উপর।
Discussion
Join the conversation
Be the first to comment