ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতি নিকোলাস মাদুরোর নাটকীয় গ্রেপ্তারের পূর্বে উত্তেজনাকর দিনগুলোতে, কূটনীতির একটি গোপন খেলা চলছিল। প্রকাশ্যে অবিচল আনুগত্যের ভাব দেখালেও, মাদুরোর ঘনিষ্ঠ বৃত্তের মূল ব্যক্তিত্ব, যার মধ্যে বর্তমান ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি দেলসি রদ্রিগেজও ছিলেন, মাদুরো-পরবর্তী যুগে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সহযোগিতা করতে গোপনে আগ্রহ দেখাচ্ছিলেন। একাধিক সূত্রের মাধ্যমে এই আলোচনার বিষয়ে সরাসরি জানা গেছে।
বহু বছর ধরে ভেনেজুয়েলা গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে নিমজ্জিত। মাদুরোর সমাজতান্ত্রিক সরকার তার স্বৈরাচারী প্রবণতা, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং অর্থনীতির অব্যবস্থাপনার জন্য ব্যাপক সমালোচিত হয়েছে, যার ফলে চরম মুদ্রাস্ফীতি, প্রয়োজনীয় পণ্যের অভাব এবং ব্যাপক অভিবাসন দেখা দিয়েছে। ট্রাম্প এবং বাইডেন উভয় প্রশাসনের অধীনেই যুক্তরাষ্ট্র মাদুরো সরকারের উপর নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার মাধ্যমে চাপ প্রয়োগের নীতি অনুসরণ করেছে, একই সাথে বিরোধী নেতা হুয়ান গুয়াইদোকে বৈধ অন্তর্বর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে, দেলসি রদ্রিগেজ এবং তার ভাই ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির প্রধান হোর্হে কর্তৃক সূচিত গোপন যোগাযোগগুলো ভেনেজুয়েলার সরকারের মধ্যেকার জটিল এবং প্রায়শই পরস্পরবিরোধী গতিশীলতার একটি ঝলক দেখায়। গার্ডিয়ানের সাথে কথা বলা সূত্র অনুসারে, রদ্রিগেজ ভাইবোনেরা মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং কাতারের কর্মকর্তাদের আশ্বাস দিয়েছিলেন যে তারা মাদুরোর প্রস্থানকে স্বাগত জানাবেন। এই কথিত প্রস্তাবগুলোর পেছনের উদ্দেশ্যগুলো জল্পনা-কল্পনার বিষয়। কিছু বিশ্লেষক মনে করেন এটি একটি বাস্তবসম্মত হিসাব ছিল, যেখানে মাদুরোর ক্ষমতার দুর্বল হয়ে যাওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে জোটবদ্ধ হওয়া তাদের নিজেদের অবস্থান রক্ষার পথ খুলে দিতে পারে। আবার কেউ মনে করেন এটি দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রকৃত উদ্বেগের কারণে এবং সংকট থেকে বেরিয়ে আসার উপায় খোঁজার আকাঙ্ক্ষা থেকে চালিত হতে পারে।
"এ ধরনের পরিস্থিতিতে এই ধরনের গোপন যোগাযোগ অস্বাভাবিক নয়," লাতিন আমেরিকার রাজনীতি বিশেষজ্ঞ রাজনৈতিক বিজ্ঞান অধ্যাপক ডঃ মারিয়া রামিরেজ ব্যাখ্যা করেন। "একটি শাসনের অভ্যন্তরের ব্যক্তি, এমনকি যারা কট্টর অনুগত বলে মনে হয়, তারাও বাজি ধরতে পারে, শাসনের পতন হলে বিকল্পগুলো খুঁজতে পারে। এটি একটি টিকে থাকার কৌশল।"
দেলসি এবং হোর্হে রদ্রিগেজের কাছ থেকে আসা কথিত আশ্বাস ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তোলে। মাদুরো এখন ক্ষমতার বাইরে, তাই দেশটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সহযোগিতার প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তব পদক্ষেপে রূপান্তরিত হবে কিনা, তা দেখার বিষয়। মার্কিন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এই কথিত যোগাযোগ নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি, তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন যে ভেনেজুয়েলার সরকারের সাথে ভবিষ্যতের যেকোনো আলোচনা সম্ভবত গণতান্ত্রিক সংস্কারের দিকে সুস্পষ্ট অগ্রগতি, মানবাধিকারের প্রতি সম্মান এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের উপর নির্ভরশীল হবে।
ভেনেজুয়েলার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রাক্তন স্টেট ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তা মাইকেল থম্পসন বলেন, "পরিস্থিতি অবিশ্বাস্যভাবে পরিবর্তনশীল।" "এখানে বিভিন্ন পক্ষ ক্ষমতার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে, এবং ফলাফল এখনো অনিশ্চিত। মূল বিষয় হল বিভিন্ন পক্ষ শান্তিপূর্ণ পরিবর্তনের জন্য আলোচনা করতে এবং ভেনেজুয়েলার জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী একটি সরকার প্রতিষ্ঠা করতে পারবে কিনা।"
মাদুরোর গ্রেপ্তার ভেনেজুয়েলার উত্তাল ইতিহাসের একটি অধ্যায় শেষ করে দিয়েছে, তবে এটি অনিশ্চয়তা এবং সম্ভাবনায় ভরা একটি নতুন অধ্যায় শুরু করেছে। সহযোগিতার গোপন প্রতিশ্রুতি, যদি খাঁটি হয়, তবে একটি স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য আশার আলো দেখাতে পারে, তবে সামনের পথটি চ্যালেঞ্জে পরিপূর্ণ এবং এর জন্য জড়িত সকল পক্ষের কাছ থেকে সতর্ক কূটনীতি প্রয়োজন।
Discussion
Join the conversation
Be the first to comment