হোয়াইট হাউসের লনে একটি পরাবাস্তব নাটকের মতো দৃশ্যটি উন্মোচিত হয়েছিল। ডোনাল্ড ট্রাম্প, অপ্রত্যাশিতভাবে দ্বিতীয় মেয়াদে বছরখানেক পার করে একদল সাংবাদিকের সামনে দাঁড়িয়ে প্রায় দুই ঘণ্টার একটি স্বগতোক্তি শুরু করেন, যেখানে তিনি নিজের কাজের বিষয়ে আত্ম-প্রশংসামূলক ঘোষণা থেকে শুরু করে কুইন্সে কাটানো তারুণ্যের এলোমেলো গল্প বলেন। Vox-এর ক্যামেরন পিটার্স-এর বর্ণনা অনুযায়ী, এই সংবাদ সম্মেলনটি ছিল "অসংলগ্ন" এবং "অসৎ"। এই পারফরম্যান্স দেখে অনেকেই ভাবছেন: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭তম রাষ্ট্রপতি কি তার নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছেন?
এটি কেবল একজন মানুষের মানসিক অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন নয়; এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে বিস্তৃত সামাজিক অস্বস্তির একটি প্রতিফলন। আমরা এমন একটি বিশ্বে বাস করি যা ক্রমবর্ধমানভাবে অ্যালগরিদম দ্বারা আকৃতি পাচ্ছে যা মানুষের আচরণ বিশ্লেষণ, ভবিষ্যদ্বাণী এবং এমনকি অনুকরণ করে। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা যখন এই জটিল পরিস্থিতি মোকাবেলা করছেন, তখন প্রকৃত নেতৃত্ব এবং এআই-চালিত কারসাজির মধ্যেকার পার্থক্য ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে উঠছে।
ট্রাম্পের সাম্প্রতিক আচরণ, যার মধ্যে পূর্বে উল্লিখিত সংবাদ সম্মেলন এবং একটি "চিৎকারপূর্ণ" প্রাইমটাইম ভাষণ রয়েছে, তার জনসম্মুখে প্রকাশিত ব্যক্তিত্বকে কোন শক্তিগুলো প্রভাবিত করছে সে সম্পর্কে প্রশ্ন তোলে। পিটার্সের মতে, তিনি কি কেবল "অসংযত" হচ্ছেন, নাকি এর চেয়েও জটিল কিছু ঘটছে? এআই কি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তার বার্তা প্রেরণকে প্রভাবিত করছে?
রাজনৈতিক প্রচারে এআই-এর ব্যবহার নতুন কিছু নয়। ভোটারদের ব্যক্তিগতকৃত বিজ্ঞাপন দিয়ে আকৃষ্ট করতে, সামাজিক মাধ্যমে অনুভূতি বিশ্লেষণ করতে এবং এমনকি নির্বাচনের ফলাফল অনুমান করতে অ্যালগরিদম দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তবে এই সরঞ্জামগুলোর পরিশীলিততা দ্রুত বাড়ছে। এআই এখন বাস্তবসম্মত বক্তৃতা তৈরি করতে, নির্দিষ্ট দর্শকদের জন্য তৈরি করা প্ররোচনামূলক যুক্তি তৈরি করতে এবং এমনকি প্রতিপক্ষের বাগ্মিতার দুর্বলতাগুলোও সনাক্ত করতে পারে।
এমআইটি-র কম্পিউটেশনাল পলিটিক্সের অধ্যাপক ডঃ Anya Sharma ব্যাখ্যা করেন, "এআই রাজনৈতিক প্রচারের জন্য একটি অপরিহার্য হাতিয়ার হয়ে উঠছে।" "এটি প্রচারণাকে ভোটারদের আরও ভালোভাবে বুঝতে, আরও কার্যকর বার্তা তৈরি করতে এবং রিয়েল-টাইমে ঘটনাগুলোর প্রতিক্রিয়া জানাতে সহায়তা করে। তবে এর নৈতিক প্রভাব বিশাল।"
একটি উদ্বেগ হলো ভুল তথ্য ছড়ানো বা জনমতকে প্রভাবিত করার জন্য এআই ব্যবহারের সম্ভাবনা। ডিপফেকস, এআই-উত্পাদিত ভিডিও যা বিশ্বাসযোগ্যভাবে মানুষকে এমন কথা বলতে বা কাজ করতে দেখায় যা তারা কখনও করেনি, তা ক্রমশ অত্যাধুনিক এবং সনাক্ত করা কঠিন হয়ে উঠছে। কল্পনা করুন, নির্বাচনের কয়েক দিন আগে একজন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিতর্কিত বক্তব্য দেওয়ার একটি ডিপফেক ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। এতে অপূরণীয় ক্ষতি হতে পারে।
আরেকটি উদ্বেগ হলো রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বিদ্যমান পক্ষপাতিত্বকে আরও বাড়িয়ে তোলার সম্ভাবনা। অ্যালগরিদম ডেটার উপর ভিত্তি করে প্রশিক্ষিত, এবং যদি সেই ডেটা বিদ্যমান পক্ষপাতিত্বকে প্রতিফলিত করে, তবে অ্যালগরিদম সম্ভবত সেই পক্ষপাতিত্বগুলোকেই ধরে রাখবে। এর ফলে এআই-চালিত প্রচারণাগুলো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীগুলোকে নেতিবাচক বা বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে বিশেষভাবে টার্গেট করতে পারে।
ট্রাম্প যখন দাভোসে বিশ্ব নেতাদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন তার মানসিক অবস্থা এবং তার বার্তা প্রেরণে এআই-এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলছে। তিনি কেবল "মুক্তভাবে চিন্তা করছেন" নাকি কৌশলগতভাবে এআই-চালিত কৌশল ব্যবহার করছেন, বিশ্ব রাজনীতির জন্য এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী।
রাজনীতিতে এআই-এর উত্থান সুযোগ এবং চ্যালেঞ্জ উভয়ই উপস্থাপন করে। এটির মাধ্যমে প্রচারণা আরও দক্ষ এবং কার্যকর হতে পারে, তবে এটি গুরুতর নৈতিক উদ্বেগেরও জন্ম দেয়। নাগরিক হিসেবে, এই সমস্যাগুলো সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের কাছ থেকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা দাবি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ এর উপর নির্ভর করতে পারে।
Discussion
Join the conversation
Be the first to comment